স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাড়ে তিন বছরের শাসন আমল এবং বিগত দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের রাজনৈতিক চরিত্র একই সূত্রে গাঁথা বলে মন্তব্য করেছেন দেশের প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদের আইকন এবং তার হাত ধরেই এ দেশে ভিন্নমত দমন ও গণমাধ্যম রুদ্ধ করার ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল।
আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টসের (বিএজে) উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। ‘আওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’ শীর্ষক এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।
বাবা ও মেয়ের ফ্যাসিবাদের মিল: শেখ মুজিব বনাম শেখ হাসিনা
ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মাহমুদুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের ইতিহাস হচ্ছে অটোক্রেসি থেকে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস। গণতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদের ইতিহাসই হচ্ছে এই দলের আসল রূপ। আমি শাসক শেখ মুজিবকে দুই ভাগে ভাগ করি—একজন পাকিস্তানি আমলের সংগ্রামী শেখ মুজিব, আরেকজন স্বাধীন বাংলাদেশের শাসক শেখ মুজিব। আমার মূল্যায়ন অনুযায়ী, স্বাধীন বাংলাদেশের শেখ মুজিব হলেন ফ্যাসিবাদের আইকন। কারণ ফ্যাসিবাদের নিয়মই হচ্ছে, তাদের নিজেদের অপকর্মকে বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি আইকনের প্রয়োজন হয়।”
তিনি জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে একটি গোষ্ঠী সব সময় শেখ মুজিবকে শেখ হাসিনার থেকে পৃথক করার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। আসলে শেখ মুজিবের সঙ্গে শেখ হাসিনার কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। মুজিব ক্ষমতায় ছিলেন সাড়ে তিন বছর, আর হাসিনা ২০ বছরের অধিক সময়। শেখ মুজিব যদি হাসিনার মতো ২০ বছর সময় পেতেন, তবে তিনি হাসিনাকে ফ্যাসিবাদ শিখিয়ে দিতেন।” বাবা ও মেয়ের মিলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, উভয় আমলই গণমাধ্যমকে চাটুকার তৈরির কারখানায় পরিণত করেছিল।
১৬ জুনের কালো দিবস ও শাসন আমলের তুলনা:
| ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইস্যু | ড. মাহমুদুর রহমানের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মন্তব্য |
| ১৬ জুন সংবাদপত্রের কালো দিবস | এটি জাতির কাছে শেখ মুজিবের উপহার, যা গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীন কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করেছিল। |
| রক্ষী বাহিনী বনাম র্যাব | রক্ষী বাহিনীকে ভুলে যাওয়া যাবে না, কারণ রক্ষী বাহিনী হচ্ছে র্যাবের পিতা। |
| গণমাধ্যমের চাটুকারিতা | ১৯৭২-৭৫ এবং বিগত ১৫ বছরের তেলবাজির চরিত্র একই; চাটুকাররা এখন তারেক রহমানের পাশে যাওয়ার ধান্দায় আছে। |
| সাংবাদিকদের মূল দায়িত্ব | সাংবাদিকের মূল অধিকার হলো শাসককে প্রশ্ন করা; এই স্বাধীনতার সাথে কখনো আপস করা যাবে না। |
“র্যাবের পিতা রক্ষী বাহিনী, এটি ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই”
বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আজকে আমরা র্যাব নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু রক্ষী বাহিনীকে ভুলে যাই কেন? রক্ষী বাহিনী হচ্ছে র্যাবের পিতা। এটা ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি যখন বুয়েটের ছাত্র, তখন শেখ মুজিবের শাসনামল ও তার পাণ্ডাদের কীর্তি-কলাপ সচক্ষে দেখেছি। আমি দেখেছি, শেখ মনি কীভাবে একটি উর্দু পত্রিকা (পয়গাম)-এর ভবন জোরপূর্বক দখল করে বাংলার বাণী বানিয়ে ফেলেছিলেন। শেখ হাসিনা ১৫ বছরে যতগুলো দুষ্কর্ম করেছেন, তার সবকটির ক্রুড ফরম বা শুরুটা শেখ মুজিব ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যেই করে গিয়েছিলেন।”
এ সময় তিনি দেশের সাংবাদিকদের মেরুদণ্ড সোজা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা তেলবাজি থেকে মুক্ত হতে পারি না। তেলবাজি করতে করতে রাজনীতিবিদরাও একসময় চাটুকারিতা পছন্দ করতে শুরু করেন। আপনাদের মনে নেই, শেখ হাসিনার গণভবনে কৃষিকাজের ওপর একটি বড় টেলিভিশন চ্যানেলে কী বিশাল চাটুকারিতার অনুষ্ঠান করা হয়েছিল? যিনি সেই অনুষ্ঠান করেছিলেন, তিনি আবার সুযোগ বুঝে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের পাশে গিয়ে হাজির হওয়ার চেষ্টা করবেন। এটাই এ দেশের একশ্রেণীর সাংবাদিকদের চরিত্র হয়ে গেছে।”
গ্রামসির হেজিমনি তত্ত্ব ও জুলাই অভ্যুত্থানের চিরন্তন সত্য
বিএজের সভাপতি এম. আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় ‘আওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট কলামিস্ট এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম।
ড. লতিফ মাসুম তাঁর প্রবন্ধে ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্বের উদাহরণ টেনে বলেন, “কোনো স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী কেবল বুলেটের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকে না; তাদের প্রয়োজন হয় মতাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রের, যার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো গণমাধ্যম। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, যখন গণমাধ্যম জনগণের ভাষা হারিয়ে ফেলে, তখন জনগণ রাজপথে নিজেদের নতুন ভাষা তৈরি করে নেয়। ২০২৬ সালের এই জুনে দাঁড়িয়ে জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার দম্ভে সত্যকে সাময়িকভাবে ব্ল্যাকআউট করা গেলেও তাকে কখনো পরাজিত করা যায় না।”
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা সাংবাদিকদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে শাসকগোষ্ঠীকে প্রশ্ন করার অধিকার ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেন।

