শনিবার (৩১ অক্টোবর) আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পু/লিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে কেন তিনি নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তাঁর মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
তদন্তে নতুন করে সামনে এসেছে একটি সিসিটিভি ফুটেজ। এতে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ এক তরুণী ও বন্ধু দীপের সঙ্গে যান তাহসিফ। তাঁরা সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন। পরে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান তিনি। সেখান থেকে কীভাবে তাহসিফ তুরাগ নদে গেলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ওই তরুণীর বয়স আনুমানিক ২৪ থেকে ২৫ বছর। তিনি গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরেছিলেন। বারে প্রবেশের সময় তাঁর হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। দীপের মাথায় ছিল হেলমেট। তদন্তকারীরা ওই তরুণীর ছবি সংগ্রহ করেছেন। তাঁকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার আগের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
পু/লিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে মোটরসাইকেলে ওই রেস্টুরেন্ট ও বারে যান তাহসিফ। তাঁর সঙ্গে ওই তরুণী ছিলেন। পরে তাহসিফ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। তবে ওই তরুণী সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই এলাকায় মাদকসেবনের অভিযোগে টহল পু/লিশ তাঁদের ধাওয়া করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পোশাক পরা দুজন পু/লিশ কর্মকর্তাকে দেখে তাঁরা দুইদিকে দৌড়ে পালিয়ে যান। এরপর তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন বলে দাবি করেছেন দীপ। তবে ওই দুই পু/লিশ কর্মকর্তা কারা, তাঁরা কেন ধাওয়া করেছিলেন, তাহসিফ কী কারণে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
নৌপু/লিশের কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে কিছু অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
নৌপু/লিশ ঢাকা রেঞ্জের পু/লিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দীপ পুরো ঘটনার সঙ্গে ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য সামনে আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাহসিফ সত্যিই পু/লিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন, তা জানার চেষ্টা চলছে। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষাও করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। সব তথ্য পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা বের করার চেষ্টা চলছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দীপকে হেফাজতে নেয় পু/লিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করে সংস্থাটি। পরে শুক্রবার রাতে দীপকে নৌপু/লিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতেই তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম হেলাল উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হ/ত্যা মামলা করেন। পরে দীপকে ওই মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রে/ফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন নৌপু/লিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসার খবর পায় পু/লিশ। পরে নৌপু/লিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। সুরতহাল করার সময় তাহসিফের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ। প্রাথমিক তদন্তে হ/ত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাহসিফের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা রাওয়া। শনিবার দুপুরে সংগঠনটির নেতারা উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিমের সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছে। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তাঁরা। তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ঘটনার অনুসন্ধান করছে। তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছে। দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, এ ঘটনা তাঁরা ছেড়ে দেবেন না। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার চান তাঁরা।

