দেশে মোবাইল অপারেটরদের মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি টাকা কর ও বিভিন্ন ফি বাবদ সরকারের তহবিলে চলে যাচ্ছে। প্রতি ১০০ টাকা আয়ের মধ্যে ৫৬ টাকাই কেটে নিচ্ছে সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার টেলিযোগাযোগ খাতকে সহজ উপায়ে রাজস্ব আদায়ের একটি বড় হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। আর এর চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ। অতিরিক্ত করের বোঝা টানতে গিয়ে অপারেটরগুলো সেবার মানোন্নয়নে যথেষ্ট বিনিয়োগ করতে পারছে না।
এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আজ রোববার (১৭ মে ২০২৬) দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ডিজিটাল জীবনধারা: সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’।
গ্রাহকের ঘাড়ে ৩৯% করের বোঝা ও বৈশ্বিক বৈষম্য
মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একজন সাধারণ গ্রাহককে ১০০ টাকার মুঠোফোন সেবার বিপরীতে ১৮ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। অর্থাৎ, সরাসরি গ্রাহকের ঘাড়েই চেপে বসছে ৩৯ শতাংশের করভার। এছাড়া নতুন সিম কেনা বা হারিয়ে যাওয়া সিম তুলতে ৩০০ টাকা গুণতে হচ্ছে। অন্যদিকে, মোবাইল অপারেটরগুলোর কর্পোরেট মুনাফার ওপর করের হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ।
মোবাইল অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএ (GSMA)-এর তথ্য অনুযায়ী, মুঠোফোন সেবায় কর আদায়ের বৈশ্বিক গড় যেখানে মাত্র ২২ শতাংশ এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গড় ২৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা ৫৬ শতাংশ। রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম জানান, সব বাধ্যতামূলক পরিশোধ মিলিয়ে তাদের ওপর কার্যকর করের চাপ ৬৮ থেকে ৭২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়, যা গত ১৫ বছর ধরে এই শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তরঙ্গ নবায়নের বড় ধাক্কা ও গ্রাহক কমার পরিসংখ্যান
টেলিযোগাযোগ খাত থেকে সরকার মূলত দুভাবে রাজস্ব পায়—সরাসরি কর এবং তরঙ্গসহ বিভিন্ন ফি। অপারেটরগুলোকে বিটিআরসির সাথে সাড়ে ৫ শতাংশ রাজস্ব ভাগাভাগি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে ১ শতাংশ দিতে হয়। এর ওপর এ বছরই সব অপারেটরকে আগে নেওয়া তরঙ্গ নবায়ন করতে হবে, যার ফি দাঁড়াবে প্রায় ১৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যোগ হবে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার ভ্যাট।
বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, “তরঙ্গ নবায়নের এই উচ্চ ব্যয় টেলিকম অপারেটরদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই পড়ার আশঙ্কা থাকে।”
অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ইতিমধ্যেই দেশের ডিজিটাল সংযোগে ধস নেমেছে। জিএসএমএ-এর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের সক্রিয় মোবাইল গ্রাহক কমেছে প্রায় এক কোটি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমেছে ১ কোটি ৩৩ লাখ। মুঠোফোন সেবায় উচ্চ কর এবং সেবার চড়া মূল্যই এর প্রধান কারণ।
বাজেটে কর সমন্বয়ের ইঙ্গিত উপদেষ্টার
গ্রাহকদের এই ভোগান্তি ও ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে টেলিযোগাযোগ খাতের করহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে দেশের শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোন। প্রতিষ্ঠানটির চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, কর কমানো হলে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।
এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর কমানো ও নীতিগত সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, “আমরা হয়তো সব সমস্যা এই আসন্ন বাজেটে একবারে সমাধান করতে পারব না। তবে ধারাবাহিকভাবে সমাধানের জন্য আমাদের দৃশ্যমান অগ্রগতি ও প্রচেষ্টা থাকবে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেনও মনে করেন, ডিজিটাল সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারকে ভয়েস ও ডেটা প্যাক আরও সাশ্রয়ী করার দিকে দ্রুত নজর দিতে হবে।

