ইতিহাসের বড় রদবদল! ‘উই রিভোল্ট’ ও জুলাই অভ্যুত্থানসহ পাঠ্যবইয়ে যেসব বিষয় নতুন করে যুক্ত হচ্ছে

ডেস্ক রিপোর্ট
spot_img
spot_img

বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবেই সরকার বদলালেই বদলে যায় পাঠ্যবইয়ের পাতা, পালটে যায় ইতিহাসের রাজনৈতিক বয়ান। অতীতে ক্ষমতায় আসা প্রায় সব দল বা সরকারই নিজেদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইতিহাস তুলে ধরেছে বইয়ের পাতায়; যার ফলে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিভ্রান্তি ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক। তবে এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের এবং যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে নতুন নির্বাচিত সরকার।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা দূর করে এবং নির্মোহ বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে ইতিহাসের পাতা নতুন করে সাজানো হচ্ছে। ২০২৬ সালের নতুন সংস্করণের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ যুদ্ধ, সিপাহি জনতার বিপ্লব এবং ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

‘উই রিভোল্ট’ এবং কালুরঘাটের ট্রান্সমিটারের ইতিহাস

নতুন শিক্ষাক্রমের পরিমার্জিত ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা’ বইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জায়গা পাচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের কিছু ঐতিহাসিক দলিল। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালোরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বর নির্দেশ অমান্য করে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ ঘোষণার বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস এবার ‘উই রিভোল্ট’ (We Revolt) শিরোনামে একটি বিশেষ প্যারায় যুক্ত করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণাকালে ব্যবহৃত মূল ট্রান্সমিটারের ইতিহাস এবং বর্তমানে এটি যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে, সেই ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’-এর তথ্যও পাঠ্যবইয়ে নতুন করে সংযোজন করা হচ্ছে। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে হওয়া কামালপুর, বিলোনিয়া ও হিলির মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধের বীরত্বগাথা এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যুক্ত হচ্ছে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লবের অধ্যায়টিও।

যুক্ত হচ্ছে নতুন দুই অধ্যায়: রাজা শশাঙ্ক থেকে জুলাই অভ্যুত্থান

এনসিটিবি-এর নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ইতিহাস বইয়ে সম্পূর্ণ নতুন দুটি অধ্যায় যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম অধ্যায়টির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রসত্ত্বা বিকাশের স্থপতিবৃন্দ’। এই বিশেষ অধ্যায়ে বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্ক থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পর্যন্ত মোট ১০ থেকে ১১ জন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের রাষ্ট্র গঠনে অবদান নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা হবে।

দ্বিতীয় নতুন অধ্যায়টির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনোত্তর ঘটনাপ্রবাহ ও গণতান্ত্রিক বিকাশ’। এই অধ্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পালাবদল ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হবে। এখানে পর্যায়ক্রমে শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার শাসনকাল ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গগুলো স্থান পাবে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ‘জুলাই অভ্যুত্থানের’ ইতিহাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা, যা চূড়ান্ত অনুমোদন করবে ন্যাশনাল কারিকুলাম কাউন্সিল (এনসিসি)।

‘ইতিহাস কোনো বানানোর ব্যাপার না’: বিশেষজ্ঞ প্যানেল

পাঠ্যবইয়ের এই ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এনসিটিবির শিক্ষাক্রম সদস্য প্রফেসর ড. এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, “এখানে কোনো নেপোটিজম (স্বজনপ্রীতি বা দলপ্রীতি) করা যাবে না। যার যেটুকু প্রাপ্য, ইতিহাসে তিনি যেন ঠিক সেটুকুই পান। আসলে ইতিহাস তো বানানোর বা বানিয়ে লেখার কোনো ব্যাপার না। ইতিহাসের সত্যতা নির্মোহ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে একসময় সত্যে পর্যবসিত হবেই। কাজেই সেই জায়গায় আমাদের নির্মোহ থাকাটাই দেশের জন্য মঙ্গলজনক।”

অন্যদিকে ইতিহাস বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক ড. নাছির আহমদ বলেন, “আমরা বইটার কিছু জায়গায় কেবল পরিমার্জন করেছি, তবে সত্যের খাতিরে বাধ্য হয়েই কয়েকটা চ্যাপ্টারের কয়েকটা পোরশনে আমাদের ‘রিরাইটিং’ বা নতুন করে লেখায় যেতে হয়েছে। এই পরিমার্জনগুলো যথাযথভাবে যদি করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কিন্তু এই চ্যাপ্টারগুলো নিয়ে দেশে আর কোনো তর্ক-বিতর্ক বা রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি হবে না।”

ভাষা আন্দোলনের তথ্যগত ভুল সংশোধন

রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের নানা দিকসহ পাঠ্যবইয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বেশ কিছু তথ্যগত ও ঐতিহাসিক ভুলও এবার সংশোধন করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদাহরণ টেনে অধ্যাপক ড. নাছির আহমদ বলেন, “আগের বইগুলোতে তথ্যগত ভুল ছিল। প্রকৃতপক্ষে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বেই ১৯৫২ সালের একশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙা হয়েছিল। তার মানে এটি একটি স্পষ্ট তথ্যগত ভুল ছিল, যা এত বছর সংশোধন করা হয়নি। এই ভুলের সাথে কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দল যেমন—বিএনপি বা আওয়ামী লীগ জড়িত না। এটি ইতিহাসের ভুল ছিল এবং আমরা তা শুধরে নিচ্ছি।” বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই নিরপেক্ষ ও তথ্যসমৃদ্ধ পাঠ্যসূচি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের প্রকৃত ও নিখাদ ইতিহাসের মুখোমুখি করবে।

সর্বশেষ নিউজ