চীনে মাটির নিচে হাড়হিম করা তাণ্ডব! কয়লা খনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, অন্তত ৯০ শ্রমিকের মৃত্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
spot_img
spot_img

চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের একটি কয়লা খনিতে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দেশটির অন্যতম বৃহত্তম এই শিল্প বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯০ জন শ্রমিকের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। খনির ভেতরে এখনও বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিখোঁজ থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আজ শনিবার (২৩ মে ২০২৬) সকালে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়া এই প্রলয়ঙ্কারী দুর্ঘটনার খবরটি নিশ্চিত করেছে। এর আগে গতকাল শুক্রবার (২২ মে) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে (জিএমটি ১১২৯) শানসি প্রদেশের ‘লিউশেনইউ’ (Liushenyu) কয়লা খনিতে এই আকস্মিক ও শক্তিশালী বিস্ফোরণটি ঘটে।

মাটির নিচে ২৪৭ শ্রমিক: হু হু করে বাড়ল নিহতের সংখ্যা

সিনহুয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন খনির গভীরে শক্তিশালী বিস্ফোরণটি ঘটে, তখন মাটির নিচে বিভিন্ন লেভেলে মোট ২৪৭ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। ঘটনার পর পরই স্থানীয় উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে কাজ শুরু করে এবং আজ শনিবার সকালের মধ্যে অধিকাংশ শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় মাটির ওপরে বা ভূপৃষ্ঠে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

তবে খনির গভীর পকেটে আটকে পড়া শ্রমিকদের ভাগ্যে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। সিনহুয়া পরবর্তীতে নিশ্চিত করে যে, খনির ভেতর থেকে এ পর্যন্ত ৮২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া এখনও খনির গভীরে নিখোঁজ থাকা অবশিষ্ট ৯ জন শ্রমিককে উদ্ধারে অত্যন্ত নিবিড় ও ‘নিবিড় অনুসন্ধান’ (Intensive Search) চালানো হচ্ছে।

উদ্ধার অভিযান ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কড়া বার্তা

চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি (CCTV)-র প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মাথায় হেলমেট পরিহিত অসংখ্য উদ্ধারকর্মী স্ট্রেচার হাতে খনির প্রবেশমুখে ভিড় করছেন এবং পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বহু অ্যাম্বুলেন্স। আহত ও দগ্ধ শ্রমিকদের স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তরের কাজ চলছে।

এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবং উদ্ধার অভিযানে ‘অল-আউট এফোর্টস’ বা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে তিনি এই ঘটনার পেছনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। শি জিনপিং জোর দিয়ে বলেন, “দেশের প্রতিটি অঞ্চল ও বিভাগকে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন বড় ও বিপর্যয়কর দুর্ঘটনা আর না ঘটে, তা কঠোরভাবে রোধ করতে হবে।”

কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ত ধোঁয়া ও আটক খনি মালিক

খনি কর্তৃপক্ষ ও সিনহুয়া জানিয়েছে, খনিতে বিস্ফোরণের পর বাতাসে গন্ধহীন ও অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস কার্বন মনোক্সাইডের (Carbon Monoxide) পরিমাণ নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া যায়। এই বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে খনির গভীরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, যা মৃত্যুর সংখ্যা এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দেয়। প্রাথমিক রিপোর্টে মাত্র ৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে লাশের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক শ্রমিকের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

এদিকে এই মারাত্মক অনিয়ম ও অবহেলার কারণে সংশ্লিষ্ট খনি কোম্পানির এক শীর্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ইতিমধ্যেই আইনের আওতায় এনে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

চীনের খনি শিল্প ও দুর্বল নিরাপত্তা বিধি

চীনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কয়লা উৎপাদিত ও ব্যবহৃত হয়, যা দেশটির প্রধান জ্বালানি উৎস। যদিও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বেইজিং খনি সুরক্ষার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপের দাবি করে আসছে, তবুও প্রায়শই সেখানে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন ও শিথিল নিয়মকানুনের কারণে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

এর আগে ২০২৩ সালে চীনের অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া অঞ্চলের একটি উন্মুক্ত কয়লা খনি ধসে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০০৯ সালে উত্তর-পূর্ব হেইলুংচিয়াং প্রদেশের একটি খনি বিস্ফোরণে ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের বৈশ্বিক রেকর্ডের মাঝেও কয়লা খনির এই একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা চীনের অভ্যন্তরীণ কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষাকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ