জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের (রেফারেন্ডাম) দেওয়া রায় নিয়ে কোনো প্রকার আপস করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যেটা সংসদে সমাধান হয়, হবে। তবে জনগণের এই রায় যদি সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে হবে। আমরা জনগণের দাবি কোনো অবস্থাতেই ছেড়ে দেবো না।”
আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদের এলডি হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণের দাবি আদায়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার বা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার কোনো অধিকার আমাদের নেই। আমরা শতভাগ কনফিডেন্ট, এই দাবি আজ হোক কিংবা কাল— আদায় হবেই ইনশাল্লাহ।”
“আমরা বগলদাবা বিরোধীদল হবো না”
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কেমন হবে, তা স্পষ্ট করে জামায়াতের আমির বলেন, “আমাদের সিদ্ধান্ত অতীতের ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা বিগত আমলগুলোর মতো কোনো ‘বগলদাবা বিরোধীদল’ হবো না। সংসদের ভেতরে আমরা এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করবো না, যাতে জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। দেশের মানুষ আমাদের এই পবিত্র সংসদে পাঠিয়েছে তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য, কারো দালালি করতে নয়।”
সংসদ পরিচালনার আকাশচুম্বী খরচের হিসাব তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সংসদ অধিবেশন পরিচালনায় প্রতি মিনিটে রাষ্ট্রের এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা খরচ হয়। আমরা স্পিকারকে স্পষ্ট অনুরোধ জানিয়েছি, এই মূল্যবান সময়ে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, দলীয় চরিত্রহনন এবং কারো দোভাষী হয়ে মনোরঞ্জন বা তোষামোদি প্রশংসা করা— এগুলো যেন কঠোরভাবে বাদ দেওয়া হয়। আমরা সংসদে কারো দয়া বা প্রশংসা করতে আসিনি, জনগণের অধিকারের কথা বলতে এসেছি।” তিনি জানান, কোনো যৌক্তিক ইস্যুতে যদি স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী দলকে নাকচ করা হয়, তবে তারা ওয়াকআউট করবেন, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সংসদের কার্যকারিতা নষ্ট করে নয়।
সংসদে জামায়াতের উত্থাপিত প্রধান নোটিশ ও বর্তমান স্থিতি:
| উত্থাপিত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যু | সংসদের বর্তমান অবস্থা ও জামায়াতের অবস্থান |
| ১. গণভোট ও জুলাই সনদ | প্রথম নোটিশ ছিল এটি। গণভোটের ৭০% মানুষের রায়কে পাস কাটিয়ে কোনো সংশোধন মানা হবে না। |
| ২. বিধ্বস্ত ব্যাংকিং ও শেয়ার বাজার | স্টক মার্কেট ধ্বংস এবং ব্যাংকের হাড্ডি গুঁড়া হওয়ার উপক্রম। সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ। |
| ৩. প্রবাসীদের সংকট নিরসন | সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব; সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো রেসপন্স নেই। |
| ৪. সীমান্তে পুশ-ইন ও সার্বভৌমত্ব | নোটিশ প্রত্যাহারের সরকারি চাপ প্রত্যাখ্যান। দেশের স্বার্থে আলোচনা চান বিরোধীদলীয় এমপিরা। |
সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল কোনো প্রতিনিধি দেবে না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “জনগণের মূল দাবি ছিল সংবিধানের আমূল ‘সংস্কার’, কোনো জোড়াতালির ‘সংশোধন’ নয়। আর এই সংস্কারের জন্যই দেশের ৭০ ভাগ মানুষ গণভোটে রায় দিয়েছে। আমরা সংসদের ভেতরে এসে জনগণের এই ঐতিহাসিক রায়কে বদলে দিতে চাই না।”
তিনি সরকারকে রুটিন কাজ বন্ধ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, “সংবিধান সংশোধনের জন্য কোনো বিশেষ কমিটির প্রয়োজন নেই। এটা একটা সাধারণ রুটিন ওয়ার্ক। ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে এটা বিল আকারে আসবে, আমরা আলোচনায় অংশ নেবো। পাস হলে হবে, রিজেক্ট হলে রিজেক্ট হবে। কমিটি করতে হলে করতে হবে ‘সংবিধান সংস্কারের’ জন্য। সরকার যদি সংস্কারের জন্য কোনো স্বাধীন কমিশন বা প্রস্তাব দেয়, তখন আমরা তা ভেবে দেখবো।”
ব্যাংক ধ্বংস ও সীমান্ত ইস্যুতে নোটিশ গায়েবের অভিযোগ
দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আমাদের অর্থনীতির দুই প্রধান অঙ্গই আজ বিধ্বস্ত। স্টক মার্কেটকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের যা একটু হাড্ডি অবশিষ্ট ছিল, তাও এখন গুঁড়া হওয়ার উপক্রম। এছাড়া প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে আমরা সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিলেও সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া আমরা পাইনি।”
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সীমান্তে পুশ-ইন ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা নিয়ে আমরা একটি নোটিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের নোটিশদাতাকে ডেকে নিয়ে বলা হয়েছে— ‘এটা সেনসিটিভ ইস্যু, নোটিশ উইথড্র করেন’। আমাদের এমপি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থেই তিনি আলোচনা চান। প্রথমে এটি ১৪ তারিখের কার্যসূচিতে আসলেও, রহস্যজনকভাবে পরে তা বাদ দিয়ে নতুন কার্যসূচি ঠিক করা হয়। এ ধরণের আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
উক্ত মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রমুখ।

