দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। টার্মিনালের হ্যান্ডলিং কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে যুক্ত হয়েছে চীনের বিখ্যাত ‘স্যানি মেরিন হেভি ইন্ডাস্ট্রি’র তৈরি চারটি অত্যাধুনিক শিপ-টু-শোর (এসটিএস) কি গ্যান্ট্রি ক্রেন। প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩০০ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের এই ভারী যন্ত্রপাতি বহনকারী বিশেষায়িত ডেক জাহাজ ‘এমভি ল্যান হাই হং ইউন’ শুক্রবার (১৯ জুন) সন্ধ্যায় পতেঙ্গা টার্মিনালের জেটিতে এসে পৌঁছেছে। এই আমদানির মাধ্যমে পিসিটি তথা দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায় এক বড় মাইলফলক অর্জিত হলো।
টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) বাংলাদেশ জানিয়েছে, এই নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের ফলে আগামী জুলাই মাস থেকেই পিসিটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যাচ্ছে। চীনের কারখানা থেকে সরাসরি কাস্টম-মেড বা পিসিটির জন্য বিশেষভাবে তৈরি করিয়ে নেওয়া এই ৪টি ক্রেন সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে চলে, যা সরাসরি কার্বন নির্গমন রোধ করবে।
গত বছর আরএসজিটি বাংলাদেশ ২৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১৪টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি) ক্রেন যুক্ত করেছিল, যার ধারাবাহিকতায় এবার এলো এই শক্তিশালী এসটিএস ক্রেনগুলো। এগুলো জেটিতে নোঙর করা জাহাজ থেকে দ্রুততম সময়ে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এই ক্রেনগুলো অত্যন্ত আধুনিক। বন্দরের উচ্চতা সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা মেনে তৈরি এই ক্রেনগুলো রেল ট্র্যাকে বসানো থাকবে, যার ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী জেটিতে দ্রুত স্থানান্তর করা যাবে। এগুলো দিয়ে একসাথে দুটি জাহাজের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ পরিচালনা করা যাবে (প্রতি জাহাজে দুটি করে ক্রেন)। একক কনটেইনার অপারেশনে এগুলো ৪০ টন, টুইন-লিফট মোডে ৪৫ টন এবং বিশেষায়িত কার্গোর ক্ষেত্রে ৬০ টন পর্যন্ত ওজন তুলতে সক্ষম। বর্তমানে বন্দরে ১২-১৩টি কনটেইনার প্রশস্ত জাহাজ বেশি আসে, তবে নতুন এই ক্রেনগুলো যুক্ত হওয়ার পর ১৬টি কনটেইনার প্রশস্ত বড় আধুনিক জাহাজও অনায়াসে হ্যান্ডলিং করা যাবে।
শিপ-টু-শোর ক্রেনগুলোর নিরাপদ খালাস প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ইতিমধ্যে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। পিসিটি-সংলগ্ন কর্ণফুলী চ্যানেলে বাকি বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বজায় রাখতে পতেঙ্গা টার্মিনালের আশেপাশে চলাচলকারী সকল সমুদ্রগামী জাহাজ, কোস্টার, ট্যাঙ্কার ও মাছ ধরার ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযানকে জেটি থেকে অন্তত ১০০ মিটার নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে কর্ণফুলী চ্যানেলের পূর্ব দিক দিয়ে নৌযান চলাচলের জন্য রুট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে মূল চ্যানেলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়। একটি বিশেষায়িত হাইড্রোলিক ট্রান্সফার সিস্টেমের মাধ্যমে জাহাজ থেকে ক্রেনগুলো আনলোড করতে প্রায় ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগবে এবং এরপর এগুলোকে পুরোপুরি সচল বা অপারেশনাল করতে আরও প্রায় এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে।
চিটাগাং চেম্বারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মশিউল আলম স্বপন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নতুন ক্রেনগুলো যুক্ত হওয়ার ফলে কনটেইনার জট যেমন কমবে, তেমনি বিদেশি বড় বড় মাদার ভেসেলগুলো অনেক কম সময়ে তাদের কার্গো খালাস করে বন্দর ত্যাগ করতে পারবে। এতদিন নিজস্ব ক্রেন থাকা (গিয়ার্ড) ছোট ছোট জাহাজ পিসিটিতে ভিড়ত। নতুন এই অত্যাধুনিক কি গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো যুক্ত হওয়ার পর কোনো ক্রেন না থাকা বড় আকারের আধুনিক (গিয়ারলেস) কনটেইনার জাহাজও এখানে সরাসরি হ্যান্ডলিং করা যাবে। এর ফলে পিসিটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ২ লাখ ৫০ হাজার টিইইউএস থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬ লাখ টিইইউএস-এ উন্নীত হবে, যা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতের খরচ এবং সময় দুটোই সাশ্রয় করবে।
এই বড় অগ্রগতি প্রসঙ্গে আরএসজিটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও জনসংযোগ প্রধান সৈয়দ আরিফ সারোয়ার বলেন, এই ক্রেনগুলো টার্মিনালের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত মাইলফলক। এটি আমাদের ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান কনটেইনার ট্রাফিক সামলানোর সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে। বিশ্বমানের এই অবকাঠামো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী জুলাই মাস থেকে টার্মিনালটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।

