ময়দা, চিনি, ডালডা ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার কারণে ২০২২ সালের জুনে হাতে তৈরি ও মেশিনে প্রস্তুত (নন-ব্র্যান্ড) পাউরুটি, বিস্কুট ও কেকজাতীয় পণ্যের দাম এক লাফে ২০ শতাংশ বাড়ায় বেকারি পণ্য প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ী সমিতি। তখন রুটির দাম বাড়ে ৫ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত, আর কেক-বিস্কুটের দাম বাড়ানো হয় ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত।
সেই থেকেই আর কখনও এসব পণ্যের দাম কমেনি, বরং সময়ে সময়ে আরও বাড়ানো হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশে এখনো এসব পণ্যের দাম নির্ধারণে কোনো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা গড়ে ওঠেনি। জবাবদিহিতার অভাবে ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছেন মালিকরা।
বর্তমানে বাজারে ১০ টাকায় যে বেকারি পণ্য মেলে, তার সংখ্যা হাতে গোনা। এমনকি পাঁচ টাকায় কোনো বিস্কুট পেতে হলেও তা আগে ছিল দুই-তিন টাকা। একই সঙ্গে, পণ্যের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে কমানো হচ্ছে। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, যাদের জন্য ভাতের বিকল্প হিসেবে এসব খাবার ছিল সহজলভ্য ও সস্তা সমাধান।
ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রস্তুতকারীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম কিংবা ভ্যাট বাড়লে তাদের হয় দাম বাড়াতে হয়, নয়তো পরিমাণ কমাতে হয়। যদিও তারা দাবি করেন, জানুয়ারিতে কেক-বিস্কুটের ওপর ভ্যাট বাড়ার পর পরিমাণ কমানো হয়নি।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মো. ওয়ালিউল্লাহ বলেন, ‘সরকার তো দাম বাড়ায়নি। কারখানার মালিকরা নিজেরাই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। পরিমাণও কমছে। তাই খাওয়া বাদ দিয়েছি। বরং ১০ টাকায় পরোটা খাওয়াই ভালো।’
রিকশাচালক ফজল হোসেন জানান, আগে একটি পাউরুটি খেয়ে পেট ভরত, এখন তা হয় না। কারণ রুটির আকার ছোট হয়ে গেছে।
দোকানিরাও বলছেন, শুধু পাউরুটি নয়—সব ধরনের মোড়কজাত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে কোম্পানিগুলো। কাঁচামালের দাম বাড়লে তারা হয় দাম বাড়ায়, নয়তো পরিমাণ কমায়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে দরিদ্র মানুষের পণ্যের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে। এ দৃষ্টিভঙ্গি গরিববিরোধী। এতে মানুষের পুষ্টি ও জীবনমান হ্রাস পাবে।
একদিকে দরিদ্রদের খাদ্যে কর বাড়ছে, অন্যদিকে সুপারশপে ভ্যাট কমানো হয়েছে। সুপারশপগুলো পোস্টার সাঁটিয়ে তা প্রচার করছে। কিন্তু পাড়ামহল্লার দোকানে এক টাকার দামবৃদ্ধিও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভ্যাট বাড়ার পর প্রায় সব কোম্পানি পণ্যের পরিমাণ কমিয়েছে অথবা দাম বাড়িয়েছে। গরিবের খাবারে বাড়তি কর চাপানো অন্যায়।
বাংলাদেশ বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুর রহমান ভূঁইয়া জানান, জানুয়ারির পর পণ্যের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে আগামী বাজেটে ভ্যাট না কমলে দাম বাড়ানোর বিকল্প থাকবে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৭%, যার মধ্যে খাদ্যসামগ্রীর মূল্যস্ফীতি ৮.৬৩%।
গবেষণা সংস্থা ইয়ুথ পলিসি নেটওয়ার্কের জরিপে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির চাপে চরম সংকটে পড়েছেন রিকশাচালক, দিনমজুর, শিক্ষার্থীসহ নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ।
মার্চে ১,০২২ জনের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ৯৯% উত্তরদাতা অর্থাভাবে কখনো না কখনো ভারী খাবার বাদ দিয়েছেন। বিকল্প হিসেবে পাউরুটি, বিস্কুট বা কলা খেয়েছেন। ৬০% বলেছেন, সকালের নাশতা বাদ দিতে হয়। অনেক সময় দুপুর বা রাতের খাবারও খাওয়া সম্ভব হয় না।
জরিপে অংশ নেওয়া ৯০৪ জন বলেন, তারা বোতলজাত পানি কিনতে পারেন না। ৮৯৭ জন মনে করেন, আগের বাজেট দরিদ্রদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেয়নি। ৭০১ জন বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে ভ্যাট বেশি। ৬০৫ জন বলছেন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কর কমানো দরকার।
গবেষণা বলছে, দরিদ্রদের ওপর ভ্যাটের চাপ অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক। সরকারের উচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে ভ্যাট বাতিল বা সর্বোচ্চ ৫% নির্ধারণ করা।

