রাজস্ব আদায়ে জিরো টলারেন্স চসিক মেয়রের

চট্টগ্রাম ব্যুরো
spot_img
spot_img

চট্টগ্রাম মহানগরীর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। কর ফাঁকি দেওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিশোধ না করার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাজস্ব আদায়ে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন তিনি। মেয়র সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কর বা ট্যাক্সের ব্যাপারে ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান—কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

গতকাল বুধবার (২০ মে ২০২৬) টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ের সভাকক্ষে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এই কড়া নির্দেশনা দেন। সভায় চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামালসহ রাজস্ব বিভাগের সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্যিক রাজধানীতে কমছে কর: রেলওয়ের বকেয়া ৫৪ কোটি

পর্যালোচনা সভায় উঠে আসে যে, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বাণিজ্যিক রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন খাত থেকে চসিকের রাজস্ব আদায় এখনো আশানুরূপ নয়। বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব এখনও আদায়ের বাইরে রয়ে গেছে। এর পেছনে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি, বড় বড় শিল্প গোষ্ঠীর কর ফাঁকির প্রবণতা এবং চসিকের নিজস্ব লজিস্টিক ও তীব্র জনবল সংকটকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ক্যান্টনমেন্ট ও ইপিজেড (EPZ) এলাকায় কিছু আইনি জটিলতার কারণেও শতভাগ কর আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।

সভায় সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য দেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। তিনি জানান, সরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কর আদায়ের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ ও কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে চসিকের প্রতি বছর প্রায় ২০ কোটি টাকা পাওনা থাকলেও তাদের বার্ষিক বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় তা আদায় করা যাচ্ছে না। ফলে জমতে জমতে চসিকের পাওনা বাবদ শুধুমাত্র রেলওয়ের কাছেই মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৪ কোটি টাকায়।

বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ফাইভ স্টার হোটেলে রি-অ্যাসেসমেন্ট

সরকারি ও বেসরকারি খাতের এই বিশাল অঙ্কের বকেয়া টাকা দ্রুত কোষাগারে তুলতে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সভায় বেশ কিছু কৌশলগত ও কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নগরীর বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ফাইভ স্টার হোটেল, বহুতল মার্কেট, গার্মেন্টস কারখানা এবং প্রাইভেট কন্টেইনার ডিপোগুলোর হোল্ডিং ট্যাক্স অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়ন (রি-অ্যাসেসমেন্ট) করতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত আয়ের চেয়ে কম হোল্ডিং ট্যাক্স দিচ্ছে, যা বরদাশত করা হবে না।

একই সঙ্গে যারা ক্ষমতা বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে চসিকের কর পরিশোধ করছে না, তাদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে আইনি ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজস্ব কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাসিক সমন্বয় সভা ও জবাবদিহিতার আলটিমেটাম

রাজস্ব আদায়ের সার্বিক অগ্রগতি কঠোরভাবে তদারকি করতে প্রতি মাসের শুরুতে নিয়মিত সমন্বয় সভা আয়োজন করে সরাসরি মেয়রকে অগ্রগতি অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চসিকের জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত পদায়ন, ইপিজেড এলাকার করযোগ্যতা পুনরায় যাচাই, কর সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রচারণা এবং মাঠপর্যায়ের কর আদায়কারী কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সমাপনী বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “নগরবাসীর করের টাকাই মূলত নগর উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। সুশাসন, শতভাগ স্বচ্ছতা ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব।” চসিকের আর্থিক ভিত শক্ত করতে তিনি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয়, সৎ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান জানান।

সর্বশেষ নিউজ