আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার ঠিক আগের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এক লাফে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল সরকার। সব ধরণের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে খুচরা ও পাইকারি উভয় স্তরেই বিদ্যুতের দাম এক ধাক্কায় অনেকখানি বাড়ানো হয়েছে। গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সাথে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯.৮৫ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন চার্জ ২৩.৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আজ বুধবার (৩ জুন ২০২৬) বিকেলে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন এই দাম ও ট্যারিফ আদেশ ঘোষণা করেছে খোদ বিদ্যুৎ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন এই বর্ধিত দাম চলতি জুন মাস (২০২৬) থেকেই সারা দেশে কার্যকর হবে।
প্রতি ইউনিটে কত বাড়ল? স্লাবভিত্তিক নতুন মূল্য তালিকা
বিইআরসির অফিশিয়াল আদেশ অনুযায়ী, বিভিন্ন ধাপের (স্লাব) গ্রাহকদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে এবার সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৯.৯৪ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়ানো হয়েছে।
হিসাব করে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম বর্তমানের ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে পিডিবির বিক্রয় মূল্য বর্তমানের ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে গড় দাম ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। এছাড়া, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)-এর সঞ্চালন খরচ প্রতি ইউনিটে গড় ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ পয়সা করা হয়েছে।
বিইআরসি ঘোষিত বিদ্যুতের নতুন দামের একনজরে খতিয়ান:
| বিদ্যুতের পর্যায় ও খাতসমূহ | বর্তমান মূল্য (প্রতি ইউনিট) | জুন ২০২৬ থেকে নতুন মূল্য | দাম বৃদ্ধির চূড়ান্ত হার (%) |
| গ্রাহক/খুচরা পর্যায় (গড়) | ৯ টাকা ১১ পয়সা। | ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। | ১৬.৬৮% (ধাপভেদে ১৫% থেকে ১৯.৯৪%)। |
| পাইকারি পর্যায় (গড়) | ৭ টাকা ০০ পয়সা। | ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। | ১৯.৮৫% (পিডিবি কর্তৃক বিতরণ সংস্থায় বিক্রয়)। |
| সঞ্চালন চার্জ (গড়) | ৩১ পয়সা। | ৩৯ পয়সা। | ২৩.৯৬% (পিজিসিবির সঞ্চালন খরচ)। |
‘মানুষের ব্যয় বাড়বে, তবে কোনো চাপ ছিল না’—বিইআরসি চেয়ারম্যান
বাজেট পেশের ঠিক আগমুহূর্তে অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিদ্যুতের এই বিশাল দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তাড়াহুড়োর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান স্পষ্ট করে বলেন, “দাম বাড়ানোর জন্য কমিশনের ওপর রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পক্ষ থেকে কোনো চাপ ছিল না। মূলত আগামী অর্থ বছরের বাজেটকে মাথায় রেখেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ট্যারিফ নির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।”
গ্রাহকদের ওপর আর্থিক চাপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেন, “এই দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অবশ্যই বাড়বে। তবে এর ফলে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ঠিক কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন বা সমীক্ষা এখনো করা হয়নি। তবে পরবর্তীতে এটা করার সুযোগ আছে।”
উৎপাদন খরচের বিশাল ঘাটতি ও বিগত নির্বাহী আদেশের খতিয়ান
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) তাদের আবেদনের সপক্ষে জানিয়েছে, আগামী ২০ Font ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ পড়বে ১২.৯১ টাকার মতো। এই বিশাল ঘাটতি ও ভর্তুকির চাপ সামাল দিতেই গত ২০ ও ২১ মে পিডিবির আবেদনের ওপর গণশুনানি শেষে এই মূল্যবৃদ্ধির আদেশ দিল বিইআরসি।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ এবং পাইকারি দর ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তবে এবার নির্বাহী আদেশ নয়, বরং বিইআরসি আইনের ক্ষমতাবলে গণশুনানির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই এই মূল্যবৃদ্ধির আইনি ঘোষণা দেওয়া হলো। বাজেটের মুখে এই দরবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নিত্যদিনের পকেটে বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি করবে।

