প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর: ৯ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে ৩৩ দফার ঐতিহাসিক ঐকমত্য

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শ্রমবাজার, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষাসহ ৯টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে দুই দেশ ঐতিহাসিক ঐকমত্যে পৌঁছেছে। সফর শেষে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন এই সফরের বিস্তারিত সাফল্য তুলে ধরেন।

মুখপাত্র জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেন। মাত্র ১৮ ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফরে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম এবং রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।

লালগালিচা সংবর্ধনা ও রাজকীয় আতিথেয়তা

মালয়েশিয়া সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও ঐতিহ্যবাহী গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী জুলকিফলি হাসান।

বিমানবন্দর থেকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে কুয়ালালামপুরের শাংগ্রি-লা হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত বৈঠক এবং পরবর্তীতে প্রতিনিধি পর্যায়ে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

৩৩ পয়েন্টের যৌথ বিবৃতি এবং ৯টি মূল খাত

দুই শীর্ষ নেতার আলোচনার পর দুই দেশের সম্মতিতে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩৩টি পয়েন্টের একটি বিশদ যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো:

১. রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা

২. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ (এফটিএ চুক্তি স্বাক্ষর ত্বরান্বিত করা)

৩. হালাল শিল্প ও ডিজিটাল অর্থনীতি

৪. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি

৫. শ্রমবাজার ও জনশক্তি কল্যাণ

৬. শিক্ষা ও যৌথ গবেষণা (১১ হাজার শিক্ষার্থীর উন্নয়ন)

৭. পর্যটন ও জ্বালানি খাত

৮. প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা

৯. সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও কর্মীদের বৈধতা

এই সফরের অন্যতম বড় অর্জন ছিল বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের দুয়ার পুনরায় উন্মুক্ত করার আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও রাজার সঙ্গে আলোচনায় কম খরচে, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান।

একই সঙ্গে, বিভিন্ন আইনি জটিলতায় মালয়েশিয়ায় অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের মানবিক বিবেচনায় বৈধতার আওতায় আনা অথবা প্রয়োজন হলে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের হাই-টেক পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বাড়াতে পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পারডুয়া ও এমএমসি পোর্ট-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বৈঠক করেন।

প্রতিরক্ষা খাতে সামরিক প্রশিক্ষণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথ সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ স্বাক্ষরিত হয়।

একনজরে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের মূল অর্জনসমূহ
অর্জনের ক্ষেত্র মূল সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতি
সফরের ধরণ ও সময় প্রথম রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফর, স্থায়িত্বকাল: ১৮ ঘণ্টা
দ্বিপাক্ষিক দলিল ১টি সংস্কৃতি বিষয়ক MoU এবং ২টি এক্সচেঞ্জ অব নোটস স্বাক্ষর
যৌথ ঘোষণা ৯টি খাতের ওপর ভিত্তি করে ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি প্রকাশ
শ্রমবাজার এজেন্ডা কম খরচে কর্মী নিয়োগ ও অনিয়মিত বাংলাদেশিদের বৈধকরণের আলোচনা
বড় বিনিয়োগকারী বৈঠক পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পারডুয়া ও এমএমসি পোর্ট
আঞ্চলিক কূটনীতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আসিয়ানে (ASEAN) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে সমর্থন

সর্বশেষ নিউজ