পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে চরম বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। দলের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে এখন দলের ভেতর থেকেই প্রকাশ্য সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
দলের কর্মী ও মুখপাত্রদের একাংশের মধ্যে তৈরি হওয়া এই অসন্তোষের জেরে এরই মধ্যে বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলবিরোধী মন্তব্যের অভিযোগে শনিবার (৯ মে) তৃণমূল তাদের তিন মুখপাত্রকে ছয় বছরের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল থামাতে বা একতা বজায় রাখতে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কারণ ক্ষমতা হারানোর ফলে দলের অনেক অসন্তুষ্ট নেতা এখন যেকোনো পরিস্থিতিতেই মুখ খুলতে আর কুণ্ঠাবোধ করছেন না।
সম্প্রতি তৃণমূলের পরিচিত মুখ ও মুখপাত্র ঋজু দত্ত, যিনি প্রায়ই বিভিন্ন বিতর্কে দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন, নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে অতীতে করা ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। ঋজুর দাবি, শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন তৃণমূলের ভেতর থেকে তার বিরুদ্ধে ওই ধরনের মন্তব্য করার জন্য প্রচণ্ড চাপ ও হুমকি দেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, তাকে সুরক্ষা ও সমর্থন দেওয়ার জন্য তিনি বিজেপির প্রশংসাও করেছেন। এই পোস্টের জেরে তৃণমূল তাকে শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সামনে হাজির হতে বললেও তিনি তা করেননি বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
এদিকে সাবেক ক্রিকেটার ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভার সাবেক ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারিও দলের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন। তার বিস্ফোরক অভিযোগ, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় টিকিটের জন্য প্রতিটি প্রার্থীর কাছে ৫ কোটি টাকা করে দাবি করা হয়েছিল, যা তিনি দিতে অস্বীকার করেন। তিনি জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, খেলাধুলা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। গত বছর ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির কলকাতা সফরের সময় অরূপ বিশ্বাসের আচরণেরও সমালোচনা করেন তিনি, যার অব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বখ্যাত এই ফুটবলার ক্ষুব্ধ হয়ে অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
এছাড়া দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তৃণমূলের মুখপাত্র কোহিনূর মজুমদার ও কার্তিক ঘোষকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। কোহিনূর মজুমদার সংবাদমাধ্যমকে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য দলের নেতাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো।’
মালদার জ্যেষ্ঠ নেতা কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী নির্বাচনে হারের জন্য সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই আঙুল তুলেছেন। তিনি অভিষেকের কাজের ধরন, প্রবীণ নেতাদের প্রতি তার আচরণ এবং তার কাছে পৌঁছাতে না পারার তীব্র সমালোচনা করেছেন। একইভাবে কোচবিহারের প্রবীণ তৃণমূল নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষের মেয়ে পাপিয়া ঘোষও দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। এর আগে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ নিজেও জনসম্মুখে অভিষেকের সমালোচনা করেছিলেন।
দলের অভ্যন্তরীণ এই চরম বিশৃঙ্খলা ও নেতাদের প্রকাশ্য ক্ষোভের পুরো পরিস্থিতি নিয়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন ও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

