গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রাস্তা সংলগ্ন ৫ শতক জমি অদল-বদল না করায় ৭০ বছর বয়সী এক নিঃসন্তান বৃদ্ধের জমিতে কাজে বাধা এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে। জমি বিক্রি করতে না পারায় বার্ধক্যজনিত নানা রোগের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন সাংসারিক ব্যয় মেটাতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ওই বৃদ্ধ দম্পতি।
ঘটনাটি ঘটেছে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হুড়াভায়া খাঁ গ্রামে। ভুক্তভোগী বৃদ্ধের নাম নুরুল ইসলাম। জানা যায়, নুরুল ইসলামের অপর দুই ভাই (আব্দুল মতিন ও আবুল হোসেন মন্টু) আজিজার রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছে তাদের অংশের জমি বিক্রি করলেও নুরুল ইসলাম নিজের অংশ বিক্রি করেননি। কিন্তু উত্তর পাশের জমিও নিজের হওয়ায় আজিজার রহমান প্রায় তিন দশক আগে নুরুল ইসলামের বাড়িটি সরিয়ে দিয়ে জোরপূর্বক জমি দখলে নেন। পরবর্তীতে আর কোনো হয়রানি থেকে বাঁচতে ২০১২ সালে অন্য অংশীদার ও ক্রেতাদের বিরুদ্ধে সুন্দরগঞ্জের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি বাটোয়ারা মামলা করেন নুরুল ইসলাম। ২০১৬ সালে আদালতের দেওয়া রায় অনুযায়ী তিনি নির্ধারিত জমির ভোগদখল করে আসছেন।
সম্প্রতি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা এবং সংসারের ব্যয় মেটাতে নিজের ভোগদখল করা জমির ৫ শতাংশ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন নুরুল ইসলাম। এজন্য তিনি উপজেলার পূর্ব বৈদ্যনাথ গ্রামের আব্দুর রহিম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে একটি বায়না দলিলও করেন। কিন্তু ক্রেতা ওই বায়নাকৃত জমিতে বাড়ি করতে গেলে মৃত আজিজার রহমানের ছেলে ফারুকুল ইসলাম ও মেয়ে ফেরদৌসী বেগমসহ অন্যরা কাজে বাধা দেন। তারা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশও ডাকেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য পুলিশ দুই পক্ষকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে থানায় হাজির হতে বলে। নুরুল ইসলাম আদালতের রায়ের কপিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে থানায় গেলেও আজিজার রহমানের ছেলে-মেয়েরা টালবাহানা করেন। পরবর্তীতে গত ২০ এপ্রিল গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফেরদৌসী বেগম উল্টো একটি মামলা দায়ের করেন।
এই পরিস্থিতিতে ৫ শতক জমি বিক্রি করতে না পেরে চরম অসহায়ত্বে দিন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধ নুরুল ইসলাম দম্পতি। সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, “আমার কোনো সন্তানাদি নেই। স্বামী-স্ত্রী আমরা দুইজনেই অসুস্থ। সারা বছর ওষুধ খেতে হয়। গায়ে শক্তি নাই, কাজও করতে পারি না। তাই আমার ভোগদখল করা জমির ৫ শতক বিক্রি করতে বায়না দলিল করে দিয়েছি। বাটোয়ারা মামলার রায় পেয়েছি প্রায় ১০ বছর হলো। নকশাও করে দিয়েছে আদালত, ঢোল পিটিয়ে গেছে। এর আগে আমি কোনো জমি বিক্রি করি নাই। আমার ভাইয়েরা বিক্রি করছে। তারপরও প্রায় ৩০ বছর আগে আজিজার আমার বাড়িঘর ভাঙতে বললে আমি বাড়িঘর ভেঙে জমি ছেড়ে দেই। সেই জমি এখনো তারা আবাদ করে খায়।”
তিনি আরও বলেন, “আগে ওই জমির সাথে তার জমি ছিল, সেই জন্য তখন বাড়ি সরিয়ে দিয়ে জমি বের করে নিয়েছে। এখন রাস্তা পাকা হওয়ায় ও জমির দাম বাড়ায় আবার আমার দখলে থাকা জমি বিক্রি করতে নিষেধ করছে। কাজে বাধা দিচ্ছে এবং জমি অদল-বদল করতে চায়। আমি রাজি না হওয়ায় ৯৯৯-এ কল দিয়ে পুলিশ এনেছিল। কাগজপত্র থানায় নিয়ে গেলে তারা টালবাহানা করে। এখন মামলা দিয়ে আমার মতো নিঃসন্তান বৃদ্ধকে হয়রানি করছে। জমি বিক্রি করতে না পারলে আমরা স্বামী-স্ত্রী চিকিৎসা ও ওষুধ খাব কেমনে! বাঁচবো কীভাবে? ন্যায়বিচারের জন্য আমি সবার সহযোগিতা চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা সালমা আক্তার নামের এক নারী তার গরু বাঁধার উঠোন দেখিয়ে বলেন, “এই জমি মৃত আজিজার রহমানের। আগে ছিল নুরুল ইসলামের ভাইদের। আমরা বর্গা করছিলাম। আমাদের কাছে বিক্রিও করতে চাইছিল।”
নুরুল ইসলামের ভাতিজা খাজা মিয়া বলেন, “আমার বাবা ও অন্য চাচা জমি বিক্রি করলেও নুরুল চাচা কোনো জমি বিক্রি করেননি।” বিরোধপূর্ণ ৫ শতক জমি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এই জমি নুরুল ইসলামের। তাছাড়া আজিজারের ছেলে-মেয়েরা তো কেনা জমি আবাদও করে। কিন্তু চাচা গরিব এবং নিঃসন্তান হওয়ায়, আর জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় এত বছর পর তাঁর ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। এর ন্যায়বিচার হওয়া দরকার।”
এদিকে অন্য জমি চাষাবাদ করার বিষয়টি অস্বীকার করে আজিজার রহমানের ছেলে ফারুকুল ইসলাম দাবি করেন, “আমরা জমি কেনার পর তিনি বাটোয়ারা মামলা করেছেন। আর আদালত একতরফা রায় দিয়েছে।”

