আজ থেকে শুরু হলো নতুন ১৪৪৮ হিজরী সন

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

মহাকালের আবর্তে আরও একটি বছর পেরিয়ে আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত হলো নতুন ইসলামি বর্ষ। উদিত হয়েছে মহররমের পবিত্র নতুন চাঁদ, যার মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মাহ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ১৪৪৮ হিজরী সনে প্রবেশ করল। আরবী মাসের চাঁদ দেখা এবং হিজরি সনের হিসাব রাখা কেবল একটি ঐতিহ্যই নয়, বরং এটি ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এবং মুসলিমদের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

খেলাফতে রাশেদার যুগ থেকে শুরু করে মুসলিম বিশ্বে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত এই হিজরি সনের মাধ্যমেই সমস্ত রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, আজকের মুসলিম সমাজ তাদের নিজস্ব এই গৌরবময় ঐতিহ্য ও ইসলামের অন্যতম দিকনির্দেশনা হারিয়ে ইংরেজি সনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

হিজরি পঞ্জিকার সোনালী ইতিহাস ও খলিফা ওমরের (রা.) ভূমিকা

হিজরি সন (আরবি: سَنة هِجْريّة) হলো ইসলামি চন্দ্র পঞ্জিকার এমন এক অবিনশ্বর ব্যবস্থা, যার প্রথম বছর শুরু হয়েছিল ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ইসলামি নববর্ষের দিন থেকে। এই বছরেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবীরা মক্কার কাফেরদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে ও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মদিনায় (তৎকালীন ইয়াসরিব) দেশান্তরিত হন। ইসলামি পরিভাষায় এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে বলা হয় ‘হিজরত’।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের দীর্ঘ ১৭ বছর পর, বসরার গভর্নর আবু মুসা আশয়ারী (রা.) খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে একটি দাপ্তরিক চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি জানান— “হে আমীরুল মু’মিনীন, আমাদের কাছে রাজকীয় বহু পত্র আসে যাতে তারিখ লেখা থাকে, কিন্তু কোনো বছরের উল্লেখ থাকে না। ফলে সময়ক্রম নির্ধারণে আমাদের জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। অতএব, সময় গণনার জন্য একটি স্থায়ী সাল নির্ধারণের ব্যবস্থা করুন।”

এই অভিযোগ ও পরামর্শের পর খলিফা ওমর (রা.) সাহাবীদের নিয়ে এক জরুরি সাধারণ সভা আহ্বান করেন। সভায় হযরত আলী (রা.) হিজরতের বছর থেকে বর্ষ গণনার যুগান্তকারী প্রস্তাব দেন এবং সকলের সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়। এভাবেই খলিফা ওমরের রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে হিজরি পঞ্জিকা ব্যবহারের সূচনা ঘটে।

হিজরি চন্দ্র পঞ্জিকা বনাম খ্রিস্টীয় সৌর পঞ্জিকা:

তুলনামূলক বিষয় হিজরি সন (ইসলামী চন্দ্র পঞ্জিকা) খ্রিস্টীয় সন (গ্রেগরীয় সৌর পঞ্জিকা)
ভিত্তি চাঁদের আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল (Lunar)। সূর্যের আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল (Solar)।
মোট দিন সংখ্যা বছরে সাধারণত ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিন থাকে। বছরে সাধারণত ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিন থাকে।
সূচনার ইতিহাস রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনায় হিজরত (৬২২ খ্রিষ্টাব্দ)। হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্মবর্ষকে ভিত্তি ধরে গণনা।
বর্ষ শুরুর সময় আরবী প্রথম মাস মহররমের ১ তারিখ থেকে। ইংরেজি প্রথম মাস জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে।
রমজান ও ঈদ ছাড়া আমরা কি হিজরি সনকে ভুলে গেছি?

আজকের মুসলিম সমাজে হিজরি সনের ব্যবহার কেবল রমজান মাস, দুই ঈদ, আশুরা আর শবে বরাত বা বিশেষ কিছু ধর্মীয় দিন উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বছরের বাকি দিনগুলোতে আরবী কোন মাস বা কত তারিখ চলছে, তার কোনো খবরই আমাদের কাছে থাকে না। আরবী মাসের নতুন চাঁদ দেখার আনন্দ ও আল্লাহর ইবাদত করার তাগিদ আজ সমাজ থেকে প্রায় বিলুপ্তপ্রায়।

পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে প্রচলিত ইংরেজি নববর্ষ পালনের যে হিড়িক দেখা যায়, হিজরি নববর্ষের ক্ষেত্রে আমরা তেমন কোনো অপসংস্কৃতি বা মেকি দিবস উদযাপনের পক্ষে নই। তবে এই নতুন হিজরি সনের আগমনকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এটি আমাদের আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতীক।

ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করতে আমাদের করণীয়

হিজরি সনের হিসাব দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায় থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের করণীয়গুলো হলো—

১. আরবী মাসগুলোর নাম ও তারিখ নিয়মিত মুখস্থ রাখার চেষ্টা করা।

২. আমাদের দৈনন্দিন দিনলিপি, ডায়েরি এবং পারিবারিক ক্যালেন্ডারে ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি আরবী তারিখ ব্যবহার করা।

৩. প্রতিটি হিজরি মাসের শুরুতে আকাশে আরবী মাসের নতুন চাঁদ দেখার ঐতিহ্য ও সুন্নত আবার ফিরিয়ে আনা।

৪. নতুন প্রজন্ম ও সন্তানদের হিজরি ক্যালেন্ডার এবং ইসলামের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসের সাথে পরিচিত করানো।

নতুন বছরের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, আমরা আমাদের ইসলামি সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ভুলে যাবো না। ১৪৪৮ হিজরী সনে মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরার তৌফিক দান করুন এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য এই বছরটিকে কল্যাণকর করুন। আমীন।

সর্বশেষ নিউজ