বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে এর আগেও অসংখ্য জাদুকরী ও স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন লিওনেল মেসি। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তিনি এমন এক অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্স দেখালেন, যা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে দুর্বল আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে দুর্দান্ত জয় পেয়েছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আর আলবিসেলেস্তেদের এই রাজকীয় জয়ে সবচেয়ে বড় নায়ক ছিলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি, যিনি একাই করেছেন চোখ ধাঁধানো হ্যাটট্রিক।
৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলতে নেমেছিলেন মেসি। আর এই মাইলফলকের ম্যাচে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক পূরণ করে তিনি প্রমাণ করলেন— বয়স কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র। ম্যাচের ১৭, ৬০ এবং ৭৬ মিনিটে গোল করে দলের বড় জয় নিশ্চিত করেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আর এই একটি মাত্র ম্যাচেই লিওনেল মেসি গুঁড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিজের করে নিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের একগুচ্ছ রেকর্ড।
মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ১৬ গোলের স্পর্শ ও ৬ বিশ্বকাপ খেলার কীর্তি
আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিন গোলের ফলে বিশ্বকাপে মেসির সর্বমোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬-তে। এর মাধ্যমে তিনি জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপে করা সর্বাধিক গোলের বিশ্বরেকর্ডের সমতায় পৌঁছে গেছেন। আগামী ম্যাচে আর মাত্র একটি গোল করতে পারলেই তিনি এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে আসীন হবেন।
রেকর্ডের তালিকা এখানেই শেষ নয়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ভিন্ন ছয়টি (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬) বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন মেসি। এছাড়া ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর বিশ্বের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার বিরল কীর্তিও স্পর্শ করেছেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা এই মহাতারকা।
এক নজরে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির রেকর্ড বুক:
| অর্জিত মাইলফলক ও রেকর্ড সমূহ | পূর্বের রেকর্ডধারী বা সমকক্ষ কিংবদন্তি | মেসির বর্তমান অবস্থান ও রেকর্ড স্থিতি |
| বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ গোল | মিরোস্লাভ ক্লোসা (জার্মানি)। | ক্লোসাকে স্পর্শ করেছেন; আর ১ গোল করলেই একক শীর্ষস্থান। |
| ইতিহাসের ১ম ফুটবলার | কেউ নেই (অনন্য)। | প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। |
| ৫ বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি | ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)। | ইতিহাসের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে এই রেকর্ডের অংশীদার। |
| বক্সের বাইরে থেকে সর্বোচ্চ গোল | রিভেলিনো (ব্রাজিল)। | দূরপাল্লার শটে গোল করে রিভেলিনোর বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ। |
| সবচেয়ে বেশি বয়সী হ্যাটট্রিককারী | পিজোলা (হাঙ্গেরি, ১৯৫৪) ও রোনালদো। | ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপের প্রবীণতম হ্যাটট্রিককারী। |
বক্সের বাইরে থেকে ‘রিভেলিনো’ রেকর্ড ও ২০০ ম্যাচের মাইলফলক
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে দূরপাল্লার একটি দুর্দান্ত ও বাঁকানো শট থেকে গোল করে বিশ্বকাপে ডি-বক্সের বাইরে থেকে করা গোলের সংখ্যা বাড়িয়েছেন মেসি। এর মাধ্যমে তিনি ব্রাজিলের ১৯৭০ বিশ্বকাপ জয়ী কিংবদন্তি রিভেলিনোর একটি অন্যতম এবং মর্যাদাপূর্ণ রেকর্ডের সমতায় পৌঁছে গেছেন।
আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে এটি ছিল মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এই অনন্য অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে ২০০ বা তার বেশি ম্যাচ খেলা অল্প কয়েকজন ফুটবলারের সংক্ষিপ্ত ও অতি মর্যাদাপূর্ণ এলিট ক্লাবে নিজের নাম লেখালেন। দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসি যেভাবে নিজের পারফরম্যান্সের মান ধরে রেখেছেন, তা আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে এক পরম বিস্ময়।
বয়সের সীমানা পেরিয়ে ইব্রাহিমোভিচের প্রশংসা
৩৮ বছর বয়সে এসেও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে যেভাবে খেলিয়েছেন মেসি, তা নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত সুইডিশ তারকা জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ। মেসির এই দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকের পর সুইডিশ এই কিংবদন্তি বলেন, “মেসি এখন সব ধরণের ফুটবলেরও ঊর্ধ্বে চলে গেছে। সে যা করছে, তা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে করা অসম্ভব।”
মেসির এই চোখ ধাঁধানো সূচনা ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার লড়াইতে আর্জেন্টিনাকে বিপুল আত্মবিশ্বাস জোগাবে। একই সঙ্গে ফুটবল ইতিহাসে মেসির রাজকীয় ও কিংবদন্তি মর্যাদাকে আরও বেশি সুসংহত করল। পরবর্তী ম্যাচে পর্তুগালের লড়াই এবং ব্রাজিলের নেইমারের অনুশীলনে ফেরার খবরের মাঝে মেসির এই হ্যাটট্রিকই এখন বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া সাংবাদিকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

