ট্রাইব্যুনালে নানক-তাপসদের শাস্তি চাইলেন শহীদ ফাইয়াজের বাবা

টেবিল প্রতিবেদন
spot_img
spot_img

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ এবং মাহমুদুল রহমান সৈকতসহ ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম আনুষ্ঠানিক জবানবন্দি সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রথম সাক্ষী হিসেবে অশ্রুসিক্ত জবানবন্দি দিয়েছেন শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া। জবানবন্দিতে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জন চিহ্নিত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

‘ওরা নিরস্ত্র ছিল, পুলিশ-আওয়ামী লীগ নির্বিচারে গুলি চালায়’

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া ১৮ জুলাইয়ের সেই নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন,

“আমার একমাত্র ছেলে ফারহান ফাইয়াজ ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিল। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকাল ১০টায় সে বাসা থেকে বের হয়ে কলেজে যায়। সেখান থেকে বন্ধুদের সাথে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে অবস্থান নেয়। কিন্তু তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের ওপর চড়াও হয় এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। একপর্যায়ে আমার একমাত্র ছেলের বুকে একটি বুলেট ঢুকে যায়।”

তিনি আরও জানান, খবর পেয়ে ধানমন্ডি-২৭ অভিমুখে রওনা হওয়ার মাঝেই জানতে পারেন ফাইয়াজকে লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে পৌঁছে তিনি এক বীভৎস অবস্থা দেখতে পান; চারদিকে অসংখ্য ছাত্র রক্তে রক্তাক্ত হয়ে কাতরাচ্ছিল। আইসিইউতে ফাইয়াজের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো থাকলেও ডাক্তাররা কিছুক্ষণ পর তা খুলে মুখ ঢেকে দেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া মৃত্যু সনদে লেখা ছিল, ফারহান ঘটনাস্থলেই মারা গেছে।

💡 মামলার খতিয়ান: জুলাই বিপ্লবের গণহত্যার বিচারে এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো শহীদের পরিবারের দেওয়া প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রত্যক্ষদর্শী জবানবন্দি, যা আইনি প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

লাশ নিয়ে যেতে চেয়েছিল পুলিশ ও আওয়ামী লীগ

জবানবন্দিতে ফাইয়াজের বাবা অভিযোগ করেন, মৃত্যুর পরও ফ্যাসিস্টদের বর্বরতা থামেনি। হাসপাতালটি পুলিশ ও আওয়ামী লীগ চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। অনেক কষ্টে হাসপাতালের পিছনের গেট দিয়ে লাশ বের করে আল মারকাজুলে গোসল শেষে বিকাল সাড়ে ৫টায় রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ মাঠে প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়।

এরপর ফ্রিজিং গাড়িতে করে লাশ গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বরপার উদ্দেশ্যে রওনা দিলে কাকরাইল মোড় এবং যাত্রাবাড়ী মোড়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গাড়ি ভাঙচুর করে বাধা দেয় এবং লাশটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। এমনকি গ্রামে পৌঁছানোর পর লাশ দাফন করার জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ পরিবারটিকে মাত্র ৪০ মিনিট সময় বেঁধে দিয়েছিল। পরে রাত ৯টায় বরপা সামাজিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

চিহ্নিত ২৮ আসামির খতিয়ান

শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা ভিডিও ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রদের তথ্যের ভিত্তিতে আদালতে আসামিদের নাম উল্লেখ করেন। এজাহারভুক্ত ও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা প্রধান আসামিরা হলেন: ১) শেখ ফজলে নূর তাপস (সাবেক মেয়র, ডিএসসিসি)

২) জাহাঙ্গীর কবির নানক (সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী)

৩) হাবিবুর রহমান (সাবেক ডিএমপি কমিশনার)

৪) প্রলয় কুমার জোয়ার্দ্দার (সাবেক এডিশনাল ডিআইজি)

৫) বিপ্লব কুমার সরকার (সাবেক যুগ্ম কমিশনার)

৬) রৌশানুল হক সৈকত (মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি)

৭) শেখ বজলুর রহমান (ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগ সভাপতি)

৮) এম এ সাত্তার (মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি)

এছাড়াও তোফায়েল আহম্মেদ, মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, সৈয়দ হাসান নূর রাষ্ট্রন, মোঃ মাসুদুর রহমান বিপ্লব, ফজলে রাব্বি ও আহাদ হাসানসহ মোট ২৮ জন এবং অজ্ঞাত আরও ৫/৭ জন এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি গুলি বর্ষণ করেছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ নিউজ