২০২৪ সালের ২১ আগস্ট রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট শুরুর আগে যদি কেউ বাজি ধরতেন যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পাকিস্তানকে টানা চারটি টেস্ট ম্যাচে হারাবে—তবে ক্রিকেটবিশ্ব নিশ্চিতভাবেই তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলত। কিন্তু ২০ মে ২০২৬-এর সূর্য ওঠার পর সেই অসম্ভবই এখন এক অকাট্য বাস্তবতা। আজ সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়ে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। আর এই সিলেট টেস্ট জয়ের পর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (WTC) পয়েন্ট টেবিলে যে ওলটপালট হয়েছে, তার আঁচ সরাসরি টের পাচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত!
পয়েন্ট টেবিলে ভারতকে পেছনে ফেলল টাইগাররা
পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক ২-০ ব্যবধানে সিরিজ ধবলধোলাইয়ের পর টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় বড় লাফ দিয়েছে বাংলাদেশ। ৪৮.১৫ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ভারত যেখানে টেবিলের ছয় নম্বরে নেমে গেছে, সেখানে ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ভারতকে টপকে পাঁচ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ! অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে হোয়াইটওয়াশ হওয়া পাকিস্তান মাত্র ৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে ৯টি দলের মধ্যে টেবিলের আট নম্বরে ধুঁকছে।
কলকাতার কিংবদন্তি অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপ, ‘মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে’—এর আদলে এখন চায়ের কাপে ঝড় তোলা বাংলাদেশি সমর্থকেরা বলতেই পারেন, “মারব পাকিস্তানকে, টের পেতে হবে ভারতকে!” —
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (WTC) পয়েন্ট টেবিলের সর্বশেষ চিত্র:
| দেশের নাম | পয়েন্টের হার (%) | টেবিলের বর্তমান অবস্থান | পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ ফলাফল |
| বাংলাদেশ | ৫৮.৩৩% | ৫ম স্থান | ২-০ ব্যবধানে জয় (ধবলধোলাই) |
| ভারত | ৪৮.১৫% | ৬ষ্ঠ স্থান | পয়েন্টের মারপ্যাঁচে নিচে অবরোহণ |
| পাকিস্তান | ৮.৩৩% | ৮ম স্থান | ঘরের মাঠ ও অ্যাওয়েতে টানা ৪ হার |
ক্রিকেটের নবজাগরণ: ধ্বংসস্তূপ থেকে পদ্মফুলের প্রস্ফুটন
কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে চরম হতাশা ছিল। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ ‘খেলাধুলা’ নিয়ে আলোচনা ছিল তুঙ্গে। ওদিকে ফুটবল মাঠে হামজা চৌধুরীদের কল্যাণে যখন ফুটবলের জোয়ার আসছিল, তখন চায়ের দোকানে ক্রিকেটের ঝাঁজ অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছিল।
তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে এই টানা সিরিজ জয় যেন সেই হতাশার মাঝে এক প্রস্ফুটিত পদ্মফুল। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচ জেতানো তাইজুল ইসলাম যখন পুরস্কার হিসেবে পাওয়া স্কুটিটি মাঠেই চালিয়ে দেখছিলেন, তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে টংদোকানের আড্ডা—সবখানেই ফিরে এসেছে চেনা উন্মাদনা।
এই সিলেট টেস্টেই একসময়ের বাংলাদেশ দল হলে হয়তো প্রথম ইনিংসে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর দেড়শ রানের আগেই গুটিয়ে যেত। কিন্তু লিটন-মিরাজদের দৃঢ়তায় দল গড়ে তোলে ২৭৮ রানের লড়াকু পুঁজি। আবার ৪৩৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান যখন ভয় ধরাচ্ছিল, তখন আজ সকালে মাত্র ১৩ বলের (৯৫.২ থেকে ৯৭.২ ওভার) বিধ্বংসী স্পেলে পাকিস্তানের শেষ উইকেটগুলো উপড়ে ফেলে জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। বাউন্ডারি লাইনে শরীফুলের অবিশ্বাস্য ডাইভ কিংবা ফিল্ডারদের জানপ্রাণ লড়িয়ে দেওয়ার এই নিবেদনই টেস্ট সংস্করণে বাংলাদেশের নবজাগরণের প্রতীক।
অস্ট্রেলিয়ার চোখ রাঙানি ও শান্তর নতুন দর্শন
বাংলাদেশের এই পারফরম্যান্সের দিকে এখন বিশ্ব ক্রিকেটের বড় দলগুলোও চোখ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার একটি গণমাধ্যম আজ পাকিস্তান হারার আগেই এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেছে, “টেস্টে আমাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ তে জয়ের কিনারায় বাংলাদেশ।” উল্লেখ্য, আগামী মাসেই সীমিত ওভারের সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসছে অস্ট্রেলিয়া এবং আগস্টে বাংলাদেশ দল যাবে ক্যাঙ্গারুদের দেশে টেস্ট সিরিজ খেলতে।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ম্যাচ শেষে দলের এই মানসিক পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। বিশ্ব ক্রিকেটের আধুনিক হাওয়া ‘বাজবল’ বা আগ্রাসী ক্রিকেটের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে খেলোয়াড়দের চিন্তাভাবনায় বদল এনেছেন তিনি। ফল বের করার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ইনিংস ঘোষণার সাহসিকতা, পেসারদের আক্রমণাত্মক বোলিং—সব মিলিয়ে এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। একসময় পাকিস্তানের পেস অ্যাটাক নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা হতো, আর আজ খোদ পাকিস্তানেই বাংলাদেশের পেসারদের লাইন-লেন্থ ও সুইং নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে। সিলেট টেস্টের এই জয় কেবল একটি ম্যাচের জয় নয়, এটি বিশ্ব ক্রিকেটের কুলীনদের কাতারে বাংলাদেশের সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক মহাকাব্য।

